fbpx

একটি এপিটাফের মৃত্যু

Pinterest LinkedIn Tumblr +

সাংবাদিক বায়েজিদ মিল্কীর নতুন গল্প ‌’একটি এপিটাফের মৃত্যু’। থাকলো বিবিএস বাংলার পাঠকদের জন্য।

অফিসে একটু বেলা করেই এসেছি। যেদিন যখন আসার দরকার হয় তখনই আসি। এসেই দেখি আমার রুমের টেবিলের উপর শ্বেত পাথরের ছোট্ট একটা এপিটাফ। ওতে লেখা – ‘Here lies the man, who loves rain.’ এখানে যে শুয়ে আছে, সে বৃষ্টি ভালবাসতো। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। একটু অবাক হই। অফিসে আসার সময় বৃষ্টি ছিল না, আকাশ খানিকটা মেঘলা ছিল। কিন্তু এরই  মধ্যে যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে সেটা বুঝতে পারিনি।

আমি বৃষ্টিকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। চারদিকে তাকিয়ে দেখছি। সেও এই অফিসেই কাজ করে। একটা বেসরকারী টেলিভিশনের অফিস। নিউজ রুমটাও খুব বেশি বড় নয়। একপাশে পাশাপাশি তিনটা টেবিল। মাঝখানে কাঁচের দেয়াল। সামনেও কাঁচের পার্টিশন। রুমে বসেই পুরো নিউজ রুমটা দেখা যায়। সবাই কাজ করছে। একপাশে কয়েকটা ভিডিও প্যানেল। অনেকগুলো টেলিভিশন চলছে শব্দ ছাড়াই।

সবাই নিবিষ্ট মনে কাজ করছে। আর আমার চোখ বৃষ্টিকে খুজছে। আমি খানিকটা আনমনা। চঞ্চল চক্ষু। ওকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। ওকি আজ আসেনি। না হতেই পারে না। এপিটাফটা ওই রেখেছে। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এটা একটা সারপ্রাইজ গিফ্ট, আমার জন্য। কারণ ওকে ছাড়া এপিটাফের বিষয়ে আমি আর কাউকে কিছু বলিনি।

আমি যেখানে বসি সেটার পেছনেই একটা বিশাল কাচের জানালা। বৃষ্টি হলে আমি চেয়ার ঘুরিয়ে বৃষ্টি দেখি। আর সামনে তাকালেও বৃষ্টি। কিন্তু বৃষ্টিকে কোথাও তো দেখতে পাচ্ছি না। বাইরে এসে সিড়ির পাশে একটা সিগারেট খাবার জায়গা আছে। সেখানে এসে একটা সিগারেট ধরালাম তখনও বৃষ্টি হচ্ছে।

একদিন এখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছি আর সিগারেট টানছি। হঠাৎ দেখি পেছনে বৃষ্টি। ওর সাথে যে খুব বেশি কথা হয় তা কিন্তু নয়। মাঝে মাঝে কাজের কথাই হয়। কাজ আর বয়স দুটোরই অনেকখানি ফারাক। তাই কথা বিশেষ হয় না। বৃষ্টিকে দেখে একটু হেসে বললাম, দেখেছো সামনেও বৃষ্টি পেছনেও। তারপরও ভিজছি না।

-স্যার বৃষ্টি খুব ভালবাসেন. তাই না।

– কতটা ভালবাসি সেটা জানিনা। তবে বৃষ্টি দেখতে ভিজতে, বৃষ্টি দেখতে দেখতে সিগারেট খেতে ভাললাগে।

-তাই নাকি। আমার কিন্তু সিগারেট ভালো লাগে না। তবে আমারও বৃষ্টি ভাল লাগে।

– তোমার নামই তো বৃষ্টি। ভাল না লেগে উপায় আছে? বলে মৃদু হেসে আনমনে সিগারেট টানতে থাকি।

স্যার, অস্ফুটে বলে বলে বৃষ্টি– একটা কথা বলবো।

-বল।

-স্যার আমি বৃষ্টি দেখতে আসিনি। আপনার সিগেরেট খাওয়া দেখতে এসেছি।

– এই যে বললে সিগারেট পছন্দ করা না ..

-না, সেটা পছন্দ করি না। কিন্তু এই যে বৃষ্টি দেখতে দেখতে আপনি সিগারেট টানেন সেটা দেখতে ভালো লাগে। অকপটে বললো বৃষ্টি।

-ছেলেমানুষী।

-না স্যার, আপনি বুঝবেন না।

আমি হেসে বললাম, না বুঝবো না। আমি বৃষ্টি বুঝি, বৃষ্টিকে নয়। বলে আমি আমার রুমে চলে গেলাম। ডুবে গেলাম কাজের মধ্যে। আপতত সব ভুলে কাজ আর কাজ।

আমি আনমনে কাজ করছি। একটু পরে বৃষ্টি আবার রুমে এসে দাঁড়ালো। আমি বৃষ্টির গন্ধ পেলাম। মুখ না তুলেই বললাম – কিছু বলবে।

-স্যার, আমি কি মাঝে মাঝে আপনাকে ফোন করতে পারি?

-কাজের জন্য ফোন তো করতেই পার।

-অকাজে?

-অকাজের শত কাজ, আলস্যের সহস্র সঞ্চয়। উচ্চ কণ্ঠে একটু হেসে বললাম, না করা যাবে না। বিশেষ করে বাসায় থাকলে আরো না।

-কেন স্যার।

-বাসায় বসে ফোন কেন, কাজের কথাও বেশি বললে বিরক্ত হয় আমার গৃহকত্রী।

-আপনি বউকে ভয় পান। স্যার সবাই আপনাক ভয় পায় আর আপনি …

-ভয় নয়, অস্বস্তি। কেউ কিছু বলুক সেটা আমার ভাল লাগে না। ঝামলো এড়িয়ে চলি।

-স্যার আমি ঝামেলা? আচ্ছা ঠিক আছে, ফোন নয় ম্যাসজে পাঠানো বা ম্যাসেঞ্জার…

-কী বলতে চাও, এখনেই বল।

-স্যার সব কথা সামনা সামনি বলা যায় না। এখানে তো নয়ই। আর পরে একটা কথা মনে হলো, সেটা কী করে বলবো?

-আবার যখন দেখা হবে তখন বলবে। আমি যেমন বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করি।

-ঠিক আছে স্যার। আমি একটা ডাইরিতে সব কথা লিখে রাখবো। পরে আপনাকে দেব। আর মাঝে মাঝে ম্যাসেজ পাঠাবো। এইটুকু অনুমতি আপাতত দিন। কাতর বলায় বললো বৃষ্টি।

আমি কিছু বললাম না। বাইরে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টি থেমে গেছে। আবার কখন আসবে কে জানে।

ছুটি, ডে অফ। আবার কাজ। দিন কোথা দিয়ে কেটে যাচ্ছে টের পাচ্ছি না।

কয়েক দিন পর, অফিস রুমে ঢুকেই চোখ পড়লো এপিটাফের উপর। বৃষ্টিই দিয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই। কারণ বৃষ্টিকে ছাড়া এ বিষয়ে আর কারু সাথে কথা হয়নি। আর ও ছাড়া আর কারও মাথায় এটা এত প্রবলভাবে কাজ করতো না। কিন্তু বৃষ্টি কোথায়। ওকে তো দেখছি না।

Share.

Leave A Reply