fbpx

মার্চে সাধারণ ছুটি করোনাভাইরাস বিস্তারের প্রাথমিক কারণ

Pinterest LinkedIn Tumblr +

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্তের পর ২৬ মার্চ থেকে গোটা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। তবে এই ছুটিই যেনো কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন দলে দলে মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাওয়ায় কারণেই করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), আইসিডিডিআর,বি এবং আইদেশিসহ দেশি-বিদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এক গবেষণা এমনটাই দাবি করছে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছে জিনোমিক কনসোর্টিয়াম। এদের আওতায় বিশ্লেষণধর্মী ওই গবেষণাপত্রে দেশব্যাপী করোনার বিস্তার এবং তা প্রতিরোধে বিভিন্ন সময় লকডাউন এবং জনসাধারণের গতিবিধির ভূমিকা কেমন ছিল তা তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। করোনাভাইরাসের বিস্তাররোধে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

সরকারের এটুআই প্রোগ্রাম থেকে সংগৃহীত ফেসবুক এবং মোবাইল ফোন অপারেটরদের তথ্য বলছে, ২৩ মার্চ থেকে এই সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর ২৬ মার্চের মধ্যে মানুষ গণহারে ঢাকা ছেড়ে যায়।

এখান থেকে প্রাপ্ত ডাটার সাথে সার্স-কোভ-২ জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরাদাবি করছেন যে, মার্চ ২৩ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে ঢাকা বহির্মুখী যাতায়াতই মূলত দেশব্যাপী করোনাভাইরাস বিস্তারের প্রাথমিক কারণ।

এই গবেষণাপত্রটি সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে ‘জিনোমিক্স, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড মোবাইল ফোন ডেটা এনাবল ম্যাপিং অব সার্স-কভ-২ লিনিয়েজেস টু ইনফর্ম হেলথ পলিসি ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকরা ২০২০ সালের মার্চ মাসে এই গবেষণার কাজ শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ৩৯১টি করোনাভাইরাস এর জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়।

সেখানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস প্রবেশের সম্ভাব্য সময় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। পরবর্তীতে আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তার ঘটে।

শুধু তাই নয়, কনসোর্টিয়াম নভেম্বর ২০২০ থেকে এপ্রিল ২০২১ এর মধ্যে সংগৃহীত আরও ৮৫টি সার্স-কোভ-২ নমুনা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৩০টি ছিল লিনিয়েজ বি.১.১.২৫ (৩৫%), ১৩টি ছিল আলফা ভ্যারিয়েন্ট (বি.১.১.৭, ১৫%), ৪০ টি ছিল বিটা ভ্যারিয়েন্ট (বি.১.৩৫১,৪৭%), ১ টি ছিল লিনিয়েজ বি.১.১.৩১৫, এবং ১ টি ছিল লিনিয়েজ বি.১.৫২৫। প্রথম ঢেউয়ে করোনাভাইরাসের বিস্তারের কারণগুলোর ওপর ভিত্তি করে ভাইরাসের বিস্তার রোধে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে- যেমন এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ।

গবেষকদের মধ্যে একজন ডক্টর লরেন কাউলি বলেন, ‘কীভাবে করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, জেনোমিক এবং মবিলিটি, ঢাকা থেকে বিভিন্ন ডাটা স্ট্রিম একত্রিত করে আমরা তা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছি। এই গবেষণাটিতে মহামারি প্রতিরোধে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য মহামারির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।’

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নিকোলাস থমসন বলেন, ‘আমরা বহু বছর  ধরেই বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ওপর একসাথে কাজ করছি। বিজ্ঞানীরা যখন জনস্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সাথে যৌথভাবে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করেন তখন কতটা সাফল্য অর্জন করা যায় এই গবেষণাপত্রটি তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।’

আইইডিসিআর-এর পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘আমাদের এই কনসোর্টিয়াম বিভিন্ন সময়ে নীতিনির্ধারকদেরকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে সহায়তা করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকাতে জনসাধারণের চলাচল নিষিদ্ধ করা, পরিবহন এবং যানবাহন চলাচলে সীমাবদ্ধতা আনা, বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিন এবং যেসব দেশে উদ্বেগজনক ভেরিয়েন্ট ছিল সেখান থেকে আগত ভ্রমণকারীদের সাধারণ মানুষদের থেকে আলাদা রাখা, সময়মতো লকডাউন সিদ্ধান্ত বা প্রয়োজনবোধে আন্তর্জাতিক চলাচল সীমাবদ্ধ করা। আমাদের এই কনসোর্টিয়াম গত বছরের মার্চ মাস থেকে একত্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের এই কাজ চলমান থাকবে এবং এবং এর মাধ্যমে আমরা আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য কোভিড-১৯ এর বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্রমাণ-ভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করতে পারব।’

আইসিডিডিআর,বি-র জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার অন্যতম অগ্রদূত ডক্টর ফেরদৌসী কাদরী বলেন, ‘অনেক প্রতিকূলতা এবং লকডাউনের সীমাবদ্ধতা থাকার পরও আমার সহকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক কোলাবোরেটরদের সহযোগিতায় আমরা সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। আমাদের দায়িত্ব এই গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরো পৃথিবী জুড়েই বিভিন্ন দেশে কয়েক মাস পরপর মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন ভেরিয়েন্ট তৈরি হচ্ছে এবং এর মধ্যে কিছু ভেরিয়েন্ট ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে দেশের সব মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার। এই টিকাগুলোর কার্যকারিতা বোঝার জন্য আমাদের এ ধরনের কাজ অব্যাহত রেখে সরকারকে সময় মতো সঠিক তথ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে হবে।’

গবেষণায় ফেসবুক ডেটা ফর গুড, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি আজিয়াটা লিমিটেড জনসংখ্যা মোবিলিটি তথ্য সরবরাহ করেছে। আর বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সার্স-কোভ-২ নমুনার সিকোয়েন্সিং-এ সহায়তা করেছে।

Share.

Leave A Reply