fbpx

শুভ জন্মদিন বাংলার তাজ

Pinterest LinkedIn Tumblr +

১৯৭৫ সালে রাজনীতি করেছেন এমন কারো সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ আমার হলে অথবা কারো বক্তব্য শোনার সুযোগ থাকলে সেই বক্তব্য আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করি। একটি স্বাধীন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের নাম নিলেও যে অমোঘ শাস্তির বিধান জারি হতো সেই সব গল্প শোনা মোটেই সুখকর নয়। আমি খুব আনন্দের সাথে আবিষ্কার করি যেই আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময়ে ‘আমার বাংলা’ বইয়ে জাতির পিতাকে মাত্র কয়েক লাইনে জেনেছি। আরো আরো জানার জন্য উদগ্রীব থেকেছি সেই আমি আমার জীবদ্দশায় দেখছি “আমার বঙ্গবন্ধু” দুই বছরের শিশুও বলতে জানে। অর্থাৎ কেউ যতই চেষ্টা করুক না কেনো ইতিহাসে যার যেই প্রাপ্তি সেই প্রাপ্তি চাইলেই কখনো মুছে ফেলা সম্ভব হয় না। সময় বদলায়, সময়ের সাথে ইতিহাসের নায়কেরা তাদের প্রাপ্য জায়গা নিয়ে ফিরে ফিরে আসে।

নিজেকে ইতিহাস থেকে আড়াল করতে চাইতেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমেদ। “এমন ভাবে কাজ করবো যেনো ইতিহাসে কোথাও আমাদের নাম না লেখা থাকে অথবা মুছে যাক আমার নাম, বেঁচে থাক বাংলাদেশ” এই নির্লোভ উক্তি করা মহান ব্যক্তি চাইলেও নিজেকে ইতিহাস থেকে আড়াল করতে পারবেন না। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি ছেলেমেয়ে যখনি তাদের যুদ্ধরত দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর নাম জানবে ইতিহাসের রথে বঙ্গতাজের নাম ভেসে আসবেই।

তবে শুধুই কি প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ইতিহাসে অধিষ্ঠিত? এই প্রশ্নের উত্তরে সামনে চলে আসে ১০ এপ্রিল, ১৭ই এপ্রিলসহ পুরো ১৯৭১সাল। চলে আসে ১৯৬৬ সাল। চলে আসে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল অব্দি এই মহান নেতার রাজনৈতিক জীবন, সরকারে তার অবস্থান, সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড।

২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে কারান্তরীন করার পরে পুরো বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ সবাই যখন দিশেহারা ঠিক তখনি প্রবল মানসিক শক্তি আর বুদ্ধিমত্তা দেখিয়েছিলেন বঙ্গতাজ। পাশের দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন, সম্পর্ক গঠন আর সেই সাথে যুদ্ধরত মাতৃভূমির সরকার ও মন্ত্রিসভা গঠন করে দেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার নিরলস পরিশ্রম। মনে হতে পারে এতে লাভ কী? বাংলাদেশের সাথে হওয়া অন্যায়কে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা, মুক্তিযুদ্ধকে ইনসারজেন্সি বা কেবল মাত্র বিদ্রোহ হিসেবে না দেখানোর জন্য ১৯৭১সালে ১৭ এপ্রিল শপথ নেয়া সরকারের ভূমিকা অপরিসীম আর সৃষ্টির সম্মুখে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” এর জন্য অসীম সম্ভাবনার এই কাজের মূল নায়ক বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমেদ।ইতিহাস যদি প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সব অবদান অস্বীকারও করে তবুও ইনসারজেন্সির অপবাদ বাংলাদেশের উপর থেকে ঘোচানোর জন্য তাজউদ্দীন আহমেদের অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রবাসের আরামের জীবন বেছে নেয়ার সুযোগ থাকলেও এই স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ঈদের দিন অথবা সন্তানের জ্বরের ঘোরে পিতাকে আহবান, সবকিছু উপেক্ষা করে কেবল জন্মভূমির প্রতি,মানুষের প্রতি, নেতার প্রতি আমৃত্যু সততা ও দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বিলাসের জীবন বেশ দূরেই থাক লুঙ্গি পরে ভেজা প্যান্ট শার্ট শুকিয়েছেন বাইরে যেতে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে যেই দল ক্ষমতায় সেটি “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ”। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়ে দেশের প্রতিটি কোনায় দলকে শক্ত করার জন্য ডায়নামিক জুটি বেঁধেছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ ও বঙ্গবন্ধু। যার ফলাফল ১৯৭০ সালের নির্বাচনে স্পষ্ট। আজকের এই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে দুর্দিনে এই তাজউদ্দীন আহমেদের স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনের অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। ক্রমাগত ষড়যন্ত্রে অপাঙতেয় হয়ে পরলেও বেঈমানী করতে পারেননি। মোশতাক সরকার অলংকৃত করার সুযোগ পায়ে ঠেলে দিয়ে নিজেই বেছে নিয়েছিলেন জেলখানার ব্রাশফায়ার। নেতার প্রতি, দলের প্রতি, আদর্শের প্রতি বন্দুকের সামনেও কেমন বুক উজার করে দাঁড়িয়ে যাওয়া যায় সেই শিক্ষাও পাওয়া যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গুণী ছাত্র, বাংলাদেশের স্টেটসম্যান, পবিত্র কোরানে হাফেজ, দক্ষ, যৌক্তিক, দায়িত্বশীল ও সৎ তাজউদ্দিন আহমেদ এর কাছ থেকে।

স্বাধীন বাংলাদেশ আছে, এই দেশের ক্ষমতায় ” বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ” আছে কেবল নেই এই দুইয়ের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাওয়া, সততা দেখানো, ন্যায়ের পক্ষে থাকা আপোসহীন তাজউদ্দীন আহমেদ।

তবুও থেকে গেছে তার বেশ কিছু বক্তব্য যেই বক্তব্যগুলো আজকের বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে দেশ নিয়ে আরেকবার ভাবাবে, নিজের দায়িত্ব নিয়ে ভাবাবে।

যেমন : ক) সরকারের মিথ্যা সাফাই গাওয়া নয়; বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরিয়ে দিয়ে দেশ গড়ার কাজে গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করতে হবে। [১৭ ডিসেম্বর ১৯৭৩, সোমবার, দৈনিক বাংলা।]

খ) শুধু সংবাদপত্রে বিবৃতি প্রদান আর টেলিভিশনে চেহারা না দেখিয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উচিত দেশের জন্য কঠোর পরিশ্রম করা। [৮ ডিসেম্বর ১৯৭৩, শনিবার, দৈনিক পূর্বদেশ।]

গ) সহনশীলতা ছাড়া গণতন্ত্রের ভিত্তি রচিত হতে পারে না। ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যেন সমাজ জীবনে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে, আওয়ামী লীগের কর্মীদের তা দেখতে হবে। [৭-৮ এপ্রিল ১৯৭২, আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের পেশকৃত রিপোর্ট।]

ঘ) যে জাতি আত্মসমালোচনা করে না সে জাতি কখনোই অগ্রগতির পথে সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। [১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩, শনিবার, দৈনিক বাংলা।]

ঙ) নিজের ঘর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। [১৭ ডিসেম্বর ১৯৭৩, সোমবার, দৈনিক বাংলা।] পাঁচ. প্রতিটি বক্তব্য থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় এই যে রাজনীতিবিদ থেকে মহান রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা স্টেটসম্যান কিভাবে সামান্য একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে বড় আয়োজনের সামনে ধার করে নেয়া ব্রিটিশ আমলের ডাকোটা বিমান দিয়ে বিলাত ভ্রমণ করে রাজনীতিবিদদের জীবন কেমন হতে পারে সেই উদাহরণ তৈরি করে যেতে পারেন।

ধীরতায়,স্থিরতায়, সততায় তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখান থেকে তিনি না চাইলেও ইতিহাস তার নাম মুছে ফেলতে পারবে না, তার কাজ মুছে ফেলতে পারবেনা। এই প্রচারণার যুগে, এই বিজ্ঞাপনের যুগে গণমানুষের নেতার জন্মদিন পালনের গুরুত্ব অপরিসীম।

২৩ জুলাই ,১৯২৫ সালে গাজিপুরের কাপাসিয়ায় ইতিহাসের স্থায়ী আসনে নিজেকে বসিয়েছেন আমার মতো লাখো তরুণ তাকে শ্রদ্ধাভরে প্রতি জন্মদিনে স্মরণ করবেন। শুভ জন্মদিন বাংলার তাজ, বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমেদ।

লেখক
অন্তরা শারমিন, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Share.

Leave A Reply